চাকরি পরিবর্তন করার ভালো-মন্দ

April 20, 2021 |
Views: 487

২০১৮ সালে হওয়া একটি গবেষণায় জানা গেছে, ৩৪ বছরের কম বয়সী ব্যক্তিদের মাঝে ৭৫ শতাংশেরও বেশি সংখ্যক চাকরি পাল্টানোকে তাদের ক্যারিয়ারের জন্য ভালো মনে করে। কিন্তু এই ‘মনে করা’র মাঝে আসলে সত্যতা কতটুকু?

ক্যারিয়ার সংক্রান্ত বেশিরভাগ জিনিসের মতোই বার বার চাকরি পরিবর্তন করারও ভালো-খারাপ দুই দিকই আছে। তাই কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তা আপনার ক্যারিয়ারকে কী কী উপায়ে প্রভাবিত করতে পারে তা চিন্তাভাবনা করে নেওয়াই সবচেয়ে ভালো।

তাহলে চলুন জেনে নেই নিয়মিত চাকরি পাল্টানোর সুবিধা ও অসুবিধাগুলো।

চাকরি পরিবর্তনের ভালো দিক

১। নতুন নতুন স্কিল অর্জন করতে পারবেন

চাকরি পরিবর্তনের একটি অন্যতম লাভ হচ্ছে এটা আপনাকে নতুন নতুন জিনিসপত্র শেখার সুযোগ করে দেবে। সক্রিয়ভাবে নতুন কিছু শেখার আগ্রহ থাকা বর্তমানে চাকরির বাজারে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

নিয়মিতভাবে কোম্পানি ও কাজের পরিবেশ পরিবর্তনের মাধ্যমে আপনি নিজের জ্ঞানের পরিধি বাড়াতে এবং স্কিলগুলোকে আরও ধারালো করতে সক্ষম হবেন। পাশাপাশি ইন্ডাস্ট্রির যাবতীয় তথ্য ও সাম্প্রতিক ট্রেন্ড সম্পর্কে ধারণা রাখায়ও সাহায্য পাবেন।

২। নিজের সহজাত পরিবেশের বাইরে গিয়ে কাজ করতে বাধ্য হবেন

নতুন চাকরি মানেই নতুন পরিবেশ এবং কাজ ও দায়িত্বে ভিন্নতা। সেখানে মানিয়ে নিতে ও ভালো পারফর্ম করতে সবারই একটু বেশি চেষ্টা করতে হয়।

একই পজিশনে দীর্ঘদিন কাজ করতে করতে অনেক সময় আমরা তাতে অভ্যস্ত হয়ে যাই। চাকরির পরিবর্তন সেই অভ্যস্ততা থেকে বের হয়ে ভিন্ন ও নতুন কিছু উপভোগ করার সুযোগ দেবে, অন্যরকম পরিবেশ ও ভিন্ন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষদের মাঝে কাজ করার সুযোগ দেবে। যা ফলস্বরূপ আপনার আত্মমর্যাদা বাড়াতে এবং চাকরিক্ষেত্রে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে সাহায্য করবে।

৩। উপার্জন বাড়বে দ্রুত

বেতনের নিয়মিত বৃদ্ধি যদি আপনাকে উৎসাহিত করে তাহলে চাকরি পরিবর্তন আপনার জন্য একটি ভালো অপশন হতে পারে। কারণ দ্রুত চাকরি পরিবর্তন করা যেমন আপনাকে অনেক কিছু শেখার সুযোগ দেবে, তেমনি আপনার উপার্জনও বাড়াবে তাড়াতাড়ি। Cameron Keng এর মতে যেসব এমপ্লয়িরা একই কোম্পানিতে ২ বছরের বেশি চাকরি করেন তাদের বেতন অন্যদের থেকে প্রায় ৫০% কম হয়।

৪। প্রফেশনাল নেটওয়ার্ক বৃদ্ধি পাবে

নতুন চাকরি মানেই নতুন এমপ্লয়ার ও সহকর্মীদের সাথে পরিচয়, নতুন সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ। নিয়মিত চাকরি পরিবর্তন আপনাকে একটি বিশাল প্রফেশনাল নেটওয়ার্ক গড়ার সুযোগ করে দেবে। যা পরবর্তীতে চাকরি খোঁজাসহ আরও অনেক সমস্যা সমাধানে আপনার কাজে লাগবে।

তবে এই নেটওয়ার্ক ধরে রাখার জন্য সবার সাথে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখা জরুরি। চাকরি ছাড়ার সময় কারও সাথে কোনোরকম খারাপ আচরণ করা বা কোম্পানিকে অসুবিধায় ফেলে রেখে যাওয়া প্রফেশনাল নেটওয়ার্কে আপনাকে নেতিবাচক পরিচিতি দিতে পারে।

৫। কাজে বিরক্তি আসার সুযোগ কম

চাকরি পরিবর্তনের সাথে সাথে আপনার কাজের পরিবেশ এবং দায়িত্বেও পরিবর্তন আসবে। যা আপনার প্রফেশনের দিকে আগ্রহ ধরে রাখতে খুবই কার্যকরী। নতুন কোনো প্রজেক্টের শুরুতে আমরা যেমন উদ্যমের সাথে কাজ করি, নিয়মিত চাকরি পরিবর্তন আপনাকে নিয়মিতভাবে সেই অনুভূতি উপভোগ করার সুযোগ দেবে।

এছাড়া নতুন চাকরিতে ঢুকলে সেখানে মানিয়ে নেওয়ার একটি চাপ থাকবে। যে পরিবেশে আপনি গত এক বছর কাজ করে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন তার থেকে পরিবেশটা হবে অনেকটা আলাদা, আলাদা হবেন আপনার উচ্চতর কর্মকর্তারাও। তাই আপনার ওপর ভালো পারফর্ম করার চাপ তুলনামূলক বেশি থাকবে এবং কাজের মাত্রাও বেড়ে যাবে।

চাকরি পরিবর্তনের খারাপ দিক

১। হায়ারিং ম্যানেজাররা আপনার ওপর ভরসা পাবেন না

যে কোনো পজিশনে নতুন চাকরিজীবী নিয়োগ দেওয়া সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। একজন এমপ্লয়িকে প্রশিক্ষণ দিতে ও কোম্পানির কার্যপদ্ধতিতে পুরোপুরি অভ্যস্ত করতে অনেক সময়, অর্থ ও শ্রম ব্যয় করতে হয়। প্রশিক্ষণ শেষ হওয়ার ৬ মাস পরেই যদি আপনি অন্য কোম্পানিতে চলে যান, তাহলে আপনার পেছনে এই খরচটা করায় তাদের কোনো লাভ থাকবে না।

তাই কেউ যদি ১৮ মাসের বেশি এক চাকরিতে থাকার নজির না দেখিয়ে থাকেন, হায়ারিং ম্যানেজাররা সাধারণত তাঁদেরকে প্রাধান্য দেন না। এমনও হতে পারে যে অনেক জায়গায় আপনি ইন্টারভিউয়ের সুযোগও পাচ্ছেন না এই কারণে।

২। আপনার সিভি দুর্বল হয়ে যেতে পারে

যারা কিছুদিন পর পর চাকরি পরিবর্তন করেন, তাদের সাধারণত একটি পজিশনে থেকে বড় কোনো সাফল্য অর্জনের উদাহরণ থাকে কম। আপনি যদি নিজের সাফল্যকে সিভিতে উপস্থাপন করতে না পারেন তাহলে একই চাকরিতে আবেদন করা অন্যদের তুলনায় আপনার সিভি দুর্বল মনে হতে পারে।

আবার কর্মজীবনের অভিজ্ঞতার তুলনায় সিভি অনেক বেশি লম্বা হওয়াও চাকরিদাতারা পছন্দ করেন না। বার বার চাকরি পাল্টানোর এবং পূর্ববর্তী চাকরি ছেড়ে দেওয়ার যথাযথ কারণ প্রদর্শন খুবই জরুরি। এবং সেই কারণটা শুধুমাত্র বেতনের পার্থক্য না হয়ে আরও কিছু হলে ভালো।

৩। জ্ঞানের গভীরতা কম থাকবে

আপনার যোগ্যতা যতোই বৈচিত্র্যময় হোক এবং অভিজ্ঞতা যতোই দীর্ঘ হোক, একটা নতুন কোম্পানিতে কাজ শুরু করার সময় আপনাকে নতুন জিনিস শিখতে হবেই। দীর্ঘদিন এক জায়গায় চাকরি করলে সেই কোম্পানির কার্যপদ্ধতি ও বাণিজ্যিক মডেল সম্পর্কে যে বিশেষজ্ঞতা তৈরি হয়, তা বার বার চাকরি পরিবর্তন থেকে পাওয়া সম্ভব নয়।

টেকনিক্যাল জ্ঞানের ক্ষেত্রেও এটা একই ভাবে সত্যি। একটি প্রজেক্টের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কাজ করা আপনাকে সেই প্রজেক্ট ও এতে ব্যবহৃত স্কিলগুলোয় গভীরতর জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা লাভের সুযোগ দেবে। মাঝপথে অন্য প্রজেক্টে চলে গেলে যা হয়তো সম্ভব না।

৪। প্রত্যেকবার নতুন করে শুরু করতে হবে

নতুন জায়গায় চাকরি করা মানে আপনাকে সবকিছুই নতুন করে শুরু করতে হবে। কোম্পানির সংস্কৃতি ও কার্যপদ্ধতির সাথে পরিচিত হতে হবে, নতুন মানুষদের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে, নতুন প্রজেক্টের কাজ বুঝে নিতে হবে এবং প্রয়োজনে আপনার দৈনন্দিন রুটিনেও পরিবর্তন আনতে হবে।

এসব কিছুর পাশাপাশি টিমের নতুন সদস্য হিসেবে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে আপনাকে পরিশ্রমও করতে হবে আগের চেয়ে বেশি। একই কোম্পানিতে অনেক দিন কাজ করছেন এমন এমপ্লয়িদের অনেক সময় প্রমোশন ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা দেওয়া হয়, যা আপনার পাওয়াটা কঠিন হয়ে যাবে। অপরদিকে কোনো সমস্যার কারণে যদি টিমে সদস্য সংখ্যা কমানোর প্রয়োজন পড়ে, পুরনো বিশ্বস্ত এমপ্লয়ির চেয়ে নতুন জনের চাকরি হারানোর সম্ভাবনা থাকে বেশি।

যে কোনো কোম্পানিতে দীর্ঘদিন কাজ করলে কোম্পানির কার্যপদ্ধতি সম্পর্কে গভীর ও বিস্তারিত অভিজ্ঞতা অর্জন করা যায়। যা আপনাকে কোম্পানির একজন অন্যতম প্রয়োজনীয় সদস্য করে তুলবে। অনেকের কাছেই কোম্পানির সাফল্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারাটা বাড়তি আয়ের চেয়ে বেশি উপভোগ্য। বার বার চাকরি পরিবর্তন করলে আপনি এই অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।

৫। আত্মবিশ্বাস কমে যেতে পারে

চাকরি খোঁজা, ইন্টার্ভিউ দেওয়া, নতুন কোম্পানিতে মানিয়ে নেওয়া অথবা কোনো ইন্টার্ভিউ থেকে প্রত্যাখ্যান গ্রহণ করা – সবই মানসিকভাবে বেশ কঠিন। প্রতিটি ধাপেই অনেক পরিশ্রম ও সংকল্প নিয়ে লেগে থাকতে হয়।

বার বার চাকরি পরিবর্তন করতে গেলে কাজটা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। যার ফলস্বরূপ চাকরি খোঁজা ও ইন্টারভিউ দেওয়ার প্রক্রিয়ায় আপনার আত্মবিশ্বাসে ঘাটতি দেখা দিতে পারে।

চাকরি পরিবর্তন করা আপনার জন্য সঠিক কিনা তা অনেকাংশে নির্ভর করছে আপনার ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ওপর। কর্মজীবনের কোন সুবিধাগুলোকে আপনি বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন তার ওপর নির্ভর করেই নিতে হবে চাকরি পরিবর্তন করা বা না করার সিদ্ধান্ত।

তবে সিদ্ধান্ত যাই হোক, চাকরি ছাড়ার পর পূর্ববর্তী কোম্পানি ও সহকর্মীদের সাথে সুসম্পর্ক ধরে রাখা এবং কোম্পানি পরিবর্তনের জন্য যথাযথ কারণ থাকা আবশ্যক। আপনার ক্যারিয়ারের লক্ষ্য কী এবং চাকরির পরিবর্তন সেই পথে আপনাকে সাহায্য করবে কিনা তা ভেবে তারপরেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করুন।