বইপ্রেমীদের জন্য উপযুক্ত ১০টি ক্যারিয়ার

August 23, 2021 |
Views: 861

কখনো কি ভেবেছেন বই পড়া-কে শখ থেকে ক্যারিয়ারে পাল্টানো সম্ভব কিনা? বাস্তবতা হচ্ছে, এমন কিছু পেশা আছে যাতে বই পড়ার প্রতি এই ভালোবাসাকে কাজে লাগিয়ে আপনি বেশ ভালোই উপার্জন করতে পারবেন। কীভাবে? জানতে চাইলে পড়তে থাকুন!

১। গ্রন্থ সমালোচক

এই প্রফেশনের সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে আপনি যে শুধু বই পড়ে অর্থ উপার্জন করতে পাড়বেন তাই না, বেশির ভাগ সময় তা আপনি করতে পারবেন নিজের বাসা থেকেই।

তবে এই ক্যারিয়ারে স্থিতিশীলতা পেতে চাইলে আপনাকে শুধু ভালো পাঠক হলেই চলবে না, দক্ষ লেখকও হতে হবে।

গ্রন্থ সমালোচক হিসেবে ক্যারিয়ার গড়তে চাইলে আপনার প্রথম ধাপ হওয়া উচিত একটি ব্লগ তৈরি করা যেখানে আপনি বিভিন্ন বইয়ের রিভিউ প্রকাশ করবেন। এছাড়া কোনো পাঠক ক্লাবে অংশগ্রহণ এবং Goodreads -এর মতো বই সংক্রান্ত ওয়েবসাইটে নিজের নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে আপনার ব্লগ ও দক্ষতার দিকে মানুষজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেন। ইন্টারনেটে যথেষ্ট স্বীকৃতি পাওয়ার পর বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থা ও সম্পাদকদের সাথে যোগাযোগ করে পেশাদার গ্রন্থ সমালোচক হিসেবে কাজের খোঁজ শুরু করতে পারেন।

২। সাহিত্য অন্বেষী

Literary Scout বা সাহিত্য অন্বেষীদের মূল কাজ হচ্ছে বিদেশের বাজারে প্রকাশ হতে পারে এমন মেনুস্ক্রিপ্ট খুঁজে বের করা এবং তা বিভিন্ন দেশের প্রকাশকদের কাছে উপস্থাপন করা।

বিদেশের বাজারে প্রকাশোপযোগী বই সন্ধানের পাশাপাশি সাহিত্য অন্বেষীরা নাটক বা সিনেমা তৈরির জন্য উপযোগী উপন্যাস বা মেনুস্ক্রিপ্টের সন্ধানও করে থাকে। গ্রন্থ অবলম্বনে তৈরি নাটক-সিনেমাগুলো সাধারণত সাহিত্ব অন্বেষীদের পছন্দ ও রুচির ওপরেই নির্ভর করে। এবং যখন তাদের বেছে নেওয়া বই থেকে তৈরি মিডিয়া লাভজনক প্রতিক্রিয়া পায়, তখন সাধারণত সাহিত্য অন্বেষীকে বড় আকারের কমিশন দেওয়া হয়।

৩। অনুবাদক

বই পড়তে ভালোবাসেন এবং একাধিক ভাষায় পারদর্শী? আপনার জন্য উপযুক্ত একটা পেশা হতে পারে বই অনুবাদ করা।

আন্তর্জাতিক প্রকাশনা সংস্থাগুলো প্রায়ই বিদেশী বই অনুবাদ করার জন্য পার্ট টাইম অনুবাদক হায়ার করে। কিন্তু, শুধুমাত্র দু’টো ভাষা জানাই এই চাকরি পাওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। এই কাজে সফল হতে হলে আপনার গল্প লেখার ব্যাপারে ধারণা ও অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। কারণ অনেক ক্ষেত্রেই এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় আক্ষরিকভাবে অনুবাদ করলে গল্পের ধারা নষ্ট হয়ে যায়। অনুবাদক হিসেবে আপনার দায়িত্ব হবে বিদেশী গ্রন্থকার যা লিখেছেন সেই গল্পটিকে অটুট রেখে নিজের ভাষায় একই মেজাজ ও একই ধারাবাহিকতায় প্রকাশ করা।

৪। গ্রন্থাগাররক্ষক

বইপ্রেমীদের কাছে গ্রন্থাগার হচ্ছে সবচেয়ে প্রিয় জায়গা। আপনি যদি পিডিএফ বা ই-বুক পড়তে পছন্দও করেন, তবুও বইয়ের পাতার যে টান তা অস্বীকার করা কঠিন। আর সবচেয়ে কম খরচে বই পড়ার এই অভিজ্ঞতা উপভোগ করার উপায় হচ্ছে গ্রন্থাগার।

যারা বই পড়তে ভালোবাসেন, গ্রন্থাগাররক্ষক তাদের কাছে স্বপ্নের পেশা। আপনার প্রিয় বইগুলো আপনাকে ঘিরে রাখবে সারাদিন এবং যখন খুশি যেই বই খুশি পড়ার সুযোগ তো থাকছেই!

তবে অনেকেই মনে করেন গ্রন্থাগাররক্ষকদের কাজ শুধু বইপত্র গুছিয়ে রাখা আর কে কোন বই ধার নিলো তার ট্র্যাক রাখা। তবে অনেক ক্ষেত্রেই তা সত্যি নয়। বিশেষ করে অ্যাকাডেমিক লাইব্রেরিতে গ্রন্থাগাররক্ষকরা প্রায়ই ছাত্র ও শিক্ষকদের গবেষণার কাজে সাহায্য করে থাকেন। এছাড়া অনেক চাকরিতে শিক্ষার্থীদের ইনফরমেশন লিটারেসি শেখানোও গ্রন্থাগাররক্ষকের কাজের অংশ হিসেবে থাকে।

৫। স্ক্রিপ্ট পাঠক

স্ক্রিপ্ট রিডার হিসেবে আপনার কাজ হবে লেখকের মেনুস্ক্রিপ্ট পড়ে তার ব্যাকরণ ও বানান ঠিক করা। তবে এখানেই আপনার কাজ শেষ নয়।

একজন স্ক্রিপ্ট পাঠককে নির্দেশকের দৃষ্টিকোণ থেকেও স্ক্রিপ্টটাকে দেখার ক্ষমতা থাকতে হবে। লেখকের মূল আইডিয়াগুলো ধরে রেখে স্ক্রিপ্টটাকে কীভাবে নাটক বা সিনেমায় রূপান্তরের উপযোগী করা যায় তা জানতে হবে। এই প্রফেশনে আপনার কাজ হতে হবে দ্রুত ও নিখুঁত, কারণ প্রতিদিন একশোরও বেশি পৃষ্ঠার স্ক্রিপ্ট আপনাকে রিভিউ করতে হবে।

৬। সম্পাদক

স্থানীয় খবরের কাগজ থেকে শুরু করে বড়সড় প্রকাশনা সংস্থা – সবখানে সম্পাদকদের চাহিদা অনেক। এটি এমন একটি প্রফেশন যেখানে পড়ার পাশাপাশি আপনার লেখালেখিরও কিছু অভিজ্ঞতা থাকা চাই।

লেখকদের তৈরি করা ড্রাফটে ব্যাকরণ ও বানানের ভুল ধরতে পারার পাশাপাশি, পাঠকরা আপনার প্রকাশনা থেকে কী আশা করে তা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা এবং ধৈর্য্যশীল ও সহযোগী মনোভাব ধরে রাখতে পারা এই পেশায় সফল হওয়ার জন্য অত্যন্ত জরুরী।

৭। সাহিত্যিকদের এজেন্ট

আপনি যদি বিভিন্ন ধরনের বই পড়তে এবং নতুন লেখকদের খুঁজে বের করতে আগ্রহী হয়ে থাকেন, তাহলে এই প্রফেশনটা আপনার জন্য একেবারে উপযুক্ত।

এজেন্টদের সাহায্য নিয়েই ভবিষ্যৎ লেখক ও গ্রন্থকাররা তাদের লেখা প্রকাশ করে থাকেন। প্রকাশকদের কাছে বই নিয়ে যাওয়া, নেগোশিয়েট করা এবং বই প্রকাশ হওয়ার আগে ও পড়ে তার সঠিক প্রচারণা নিশ্চিত করাও এজেন্টদের কাজ।

একজন এজেন্ট হিসেবে আপনি নিয়মিত বেতনের পাশাপাশি বইয়ের বিক্রি থেকে কমিশনও পাবেন, যা হবে আপনার আয়ের বড় একটা অংশ। এছাড়া ক্লায়েন্টের বই দেশের বাইরে প্রকাশ করা বা সিনেমায় রূপান্তর করার মাধ্যমেও বড় আকারের কমিশন পেতে পারেন।

৮। সাহিত্য বিষয়ক অধ্যাপক

ইংরেজি বা বাংলা – যে সাহিত্যই আপনার প্রিয় হোক না কেনো, অধ্যাপনা আপনার জন্য একটি অন্যতম অপশন। তবে এর জন্য আপনার থাকতে হবে শেখার ও শেখানোর আগ্রহ।

শিক্ষার্থীদের জন্য লেকচার তৈরি করার উদ্দেশ্যে বই পড়া ও সাহিত্য নিয়ে রিসার্চ করা হবে অধ্যাপক হিসেবে আপনার দৈনন্দিন কাজের অংশ। ভিক্টোরিয়ান যুগ হোক বা আধুনিক সাহিত্য – আপনার হাতে সুযোগ থাকবে নিজের রিসার্চ ও লেকচারের বিষয় বেছে নেওয়ার। এবং সুযোগ পাবেন সেই পছন্দের বিষয় ও আপনার প্রিয় লেখকদের কাজ গভীরভাবে অধ্যয়ন করার।

তবে অধ্যাপক হতে চাইলে শুধু বই পড়লেই চলবে না। ব্যাচেলর ও মাস্টার ডিগ্রি শেষ করে নিজের বেছে নেওয়া বিষয়ে পিএইচডিও করা চাই।

৯। বই প্যাকেজার

একজন বই প্যাকেজারের মূলত দুইটি কাজ থাকে – দীর্ঘ সময় ও শ্রম দিয়ে সম্পন্ন করতে হয় এমন বইগুলোকে বাস্তবায়ন করা এবং প্রডাকশনের সব কাজ ঠিকমতো চলছে কিনা সেদিকে খেয়াল রাখা। তাদের উপরেই নির্ভর করে প্রকাশক ও গ্রন্থকারের আইডিয়ার উপযুক্ত বাস্তবায়ন।

১০। গ্রন্থ সংরক্ষক

গ্রন্থ সংরক্ষক বা আর্কাইভিস্ট হিসেবে আপনার দায়িত্ব হবে ইতিহাস সংরক্ষণ করা, যুগের পর যুগ গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলোর অক্ষত থাকা নিশ্চিত করা। এই পেশায় বিভিন্ন বিষয়বস্তু সংক্রান্ত তথ্য ও ডকুমেন্ট নিরীক্ষণ ও ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষণ হবে আপনার প্রতিদিনের কাজের অংশ।

কখনো কখনো আর্কাইভিস্টরা ঐতিহাসিক দলিলপত্র নিরীক্ষা করার কাজও করে থাকেন। বিশেষ করে ঐতিহাসিক জাদুঘরগুলোর জন্য গ্রন্থ সংরক্ষকদের দক্ষতা ও কাজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 

বর্তমান যুগে চাকরির উদ্দেশ্য আর শুধু উপার্জন করতে পারা নয়। একটু চেষ্টা করলেই এমন একটি ক্যারিয়ার গড়া সম্ভব যা আর্থিক সমৃদ্ধির পাশাপাশি মানসিক শান্তিও দিতে সক্ষম।

প্রতিটি শখ, প্রতিটি ভালো লাগার কাজকেই কোনো না কোনোভাবে পেশায় পরিণত করার সুযোগ রয়েছে। বই পড়ার শখও তার ব্যতিক্রম কিছু নয়। তাই আর দেরি না করে আপনার পছন্দের ‘বইপড়া’ সম্পর্কিত পেশা বেছে নিন আর প্রস্তুতিতে লেগে পড়ুন!