“এই বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করলেন কেনো?” – এই প্রশ্নের উত্তর দেবেন যেভাবে

September 7, 2021 |
Views: 245

টাকা, চাকরির সুযোগ অথবা কৌতুহল – পড়াশোনার বিষয় বেছে নেওয়ার পেছনে আপনার কারণ যেটাই হোক, চাকরির ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে এই প্রশ্নের সম্মুখীন আপনাকে প্রায়ই হতে হবে। ইন্টারভিউয়ারের এ ধরনের প্রশ্ন করার মূল উদ্দেশ্য হলো আপনার আগ্রহ ও নীতি সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পাওয়া। এবং আপনি যে পদে আবেদন করেছেন তার জন্য কতোটা উপযুক্ত তা যাচাই করা।

চাকরির ইন্টারভিউয়ে প্রত্যেকটা প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ, প্রত্যেকটা প্রশ্ন করার পেছনে থাকে একটা উদ্দেশ্য – আপনি এই পদের জন্য কতোটা উপযোগী তা যাচাই করা। পেশা ও ইন্ডাস্ট্রি নির্বিশেষে ইন্টারভিউয়ের এই ১৫ মিনিট চাকরি পেতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। আপনার এতো বছরের পড়াশোনা, দক্ষতা অর্জন, প্রস্তুতি – সবকিছুর সাফল্য নির্ভর করছে এই ১৫ মিনিটের পারফর্মেন্সের ওপর।

আর এই ইন্টারভিউয়ে যেসব প্রশ্ন বছরের পর বছর ধরে বার বার করা হয়ে আসছে তেমনই একটি প্রশ্ন হলো “এই বিষয় নিয়ে কেনো পড়াশোনা করেছেন?” কিন্তু কী উদ্দেশ্য এই প্রশ্নের? কীভাবেই বা তার উত্তর দেবেন? এই প্রশ্নের উত্তরে কী কোনো ভাবে আপনার দক্ষতা ও জ্ঞানের পরিধিকে ইতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব? এই সব প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবেন এই আর্টিকেলে!

১। প্রশ্নকর্তা ঠিক কী জানতে চাচ্ছেন তা বোঝার চেষ্টা করুন

বেশিরভাগ চাকরির ক্ষেত্রেই পড়াশোনা সম্পূর্ণ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু আপনার সিভিতে কোনো বিষয়ের গ্র্যাজুয়েট লেখা আছে মানেই এটা না যে আপনি ঐ বিষয়ের চাকরির জন্য যোগ্য। আবার তার মানে এটাও না যে আপনি অন্য কোনো বিষয়ের চাকরির জন্য যোগ্য না।

ইন্টারভিউয়ারের এই প্রশ্ন করার পেছনে উদ্দেশ্য হচ্ছে আপনার আগ্রহের বিষয়গুলো এবং স্কিলসেট সম্পর্কে ধারণা অর্জন। কারণ কোনো বিষয়ে ডিগ্রি থাকাই ঐ বিষয়ে দক্ষতার পরিচয় বহন করে না। একজন আর্কিটেকচার গ্র্যাজুয়েটের পক্ষেও সফটওয়্যার ডেভেলপার হিসেবেকাজ করা সম্ভব যদি তার সঠিক স্কিল থাকে।

এছাড়া পড়াশোনার পাশাপাশি আপনার এক্সট্রা-কারিকুলার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করার জন্যেও এটা একটা ভালো সুযোগ। বিশ্ববিদ্যালয় পড়াশোনা ছাড়াও আরও অনেক ধরনের সুযোগ সুবিধা দেয়। বিভিন্ন ক্লাবের কার্যক্রমে অংশগ্রহণ থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত কোনো প্রজেক্ট – এ সব কিছুর উল্লেখ করে নিজের দক্ষতাকে ইন্টারভিউয়ারের সামনে উপস্থাপন করুন।

একজন ইকমার্স কর্মী হিসেবে আপনাকে অনেক ধরনের কাজ করতে হবে। একদিন কোনো মার্কেটিং ক্যাম্পেইন পরিচালনা, তো পরের দিন ব্যবহারকারীদের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ। ওয়েবসাইটকে ব্যবহারের উপযোগী রাখা থেকে শুরু করে স্পিড ও কন্টেন্টের মতো বিভিন্ন জিনিস ট্র্যাক করা – সবই একজন ইকমার্স কর্মীর কাজের অংশ।

২। ছোট কোনো ঘটনা বর্ণনা করার মাধ্যমে উত্তর শুরু করুন

মানসিক চাপের মুখে আত্মবিশ্বাস ধরে রাখা বেশ কঠিন। কিন্তু তার মানে এই না যে সেটা ইন্টারভিউয়ারকে বুঝতে দিতে হবে। নিজেকে সাবলীলভাবে উপস্থাপন করার একটা ভালো উপায় হচ্ছে ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কথা বলা।

অর্থাৎ আপনি কেনো এই বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করতে আগ্রহী হলেন তা বর্ণনা করতে নিজের ছোটবেলার কোনো ঘটনা যা এই বিষয়ের ব্যাপারে আপনার কৌতুহল গড়ে তুলেছে তা বলতে পারেন। হয়তো কোনো বন্ধুর সাথে আলাপ করার সময় আপনার পছন্দের বিষয়টি নিয়ে কৌতুহল তৈরি হয়েছিল, অথবা হয়তো অবসরে কোনো বই পড়তে গিয়ে এ ব্যাপারে আপনার আগ্রহ জন্মেছিল। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সময়ের কোন দিকগুলো আপনাকে ইন্ডাস্ট্রির জন্য প্রস্তুত করেছে সেই গল্পও করতে পারেন ইন্টারভিউয়ারের সাথে।

৩। পড়াশোনার বিষয় থেকে অর্জিত জ্ঞান আপনি ইতোমধ্যেই কীভাবে কাজে লাগিয়েছেন তার উদাহরণ দিন

আপনার পড়াশোনার বিষয় হয়তো ইংরেজি। কিন্তু আপনি সেলস অথবা বিজনেস ডেভেলপমেন্টে কাজ করতে চাচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিজ্ঞতা থেকে অর্জিত জ্ঞান কীভাবে আপনাকে করপোরেট জগতে এগিয়ে যেতে সাহায্য করবে তা গুছিয়ে ইন্টারভিউয়ারের সাথে আলোচনা করুন। তখনই তিনি আপনার ব্যাপারে আগ্রহী হবেন।

এর জন্য আপনাকে আগে বুঝতে হবে ক্লাসগুলো থেকে বা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য অভিজ্ঞতা থেকে আপনি কী কী স্কিল অর্জন করেছেন। তেমন একটা স্কিল হতে পারে পাবলিক স্পিকিং বা প্রেজেন্টেশন দেওয়া, যা ব্যবসা ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা স্কিল। গ্র্যাজুয়েশন থেকে অর্জিত এই স্কিল আপনি কীভাবে ক্লায়েন্টদের সাথে যোগাযোগ করতে ব্যবহার করতে পারবেন তা বুঝিয়ে বলুন।

আর আপনার পড়াশোনার বিষয় এবং পছন্দের ক্যারিয়ার যদি একই হয়ে থাকে তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সময়ের বিভিন্ন কোর্স, শিক্ষকদের থেকে পাওয়া জ্ঞান এবং প্রজেক্ট-অ্যাসাইনমেন্ট থেকে অর্জিত অভিজ্ঞতা কীভাবে এই ক্যারিয়ারের জন্য আপনাকে প্রস্তুত করেছে তা উপস্থাপন করুন।

৪। পছন্দের পেশা ও পড়াশোনার বিষয়ের মধ্যে মিলগুলো খুঁজে বের করুন

আপনার ইংরেজি সাহিত্যের ডিগ্রির সাথে বিজনেস ডেভেলপমেন্টের ঠিক কী মিল আছে? এমন কী কী কাজ বা অভিজ্ঞতা আপনার পড়াশোনার সময় হয়েছে যা চাকরি জীবনেও আপনার করতে হতে পারে? কোন সমস্যাগুলোর সমাধান করেছেন যা ক্যারিয়ারের বিভিন্ন পরিস্থিতির জন্য আপনাকে প্রস্তুত করেছে?

ইন্টারভিউ শুরুর আগেই এই বিষয়গুলো ভেবে নিন। সব বিষয়ের পড়াশোনাতেই কিছু ‘ট্রান্সফারেবল স্কিল’ শেখার সুযোগ থাকে। কেনো একটি বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করেছেন তার উত্তর আপনার জ্ঞান ও দক্ষতাকে উপস্থাপন করার বড় সুযোগ। তবে এমন কোনো স্কিল নিয়ে কথা বলবেন না যা আপনার পছন্দের ক্যারিয়ারের সাথে সম্পর্কিত নয়।

৫। আপনার আগ্রহ উপস্থাপন করুন

বর্তমান যুগের শিক্ষার্থী ও তরুণ চাকরিজীবীরা দিন দিন পেশা বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে বেতন বা সুযোগ-সুবিধার চেয়ে আগ্রহ ও পছন্দকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া শুরু করেছেন। আজকের দিনের চাকরিজীবীরা তাদের কাজের ব্যাপারে উৎসাহী। তারা তাদের কাজকে ভালোবাসেন বলেই এই পেশা বেছে নিয়েছেন। আর চাকরিদাতারাও চান এমন কাউকে নিয়োগ দিতে যে উৎসাহ ও উদ্দীপনার সাথে তার কাজ সম্পন্ন করবেন।

কিন্তু নিজের এই আগ্রহকে আপনি ইন্টারভিউয়ারের সামনে কীভাবে উপস্থাপন করবেন?

পেশার এমন একটি দিক বেছে নিন যা আপনি সত্যিকার অর্থেই উপভোগ করেন।
এই দিকটা কেনো আপনাকে এতোটা আগ্রহী করেছে তা বর্ণনা করুন।
এই বিষয়ে আপনার সাফল্য ও ব্যর্থতার উদাহরণ দিন এবং ব্যর্থতা অতিক্রম করতে কী করেছেন তা উল্লেখ করুন।
যে চাকরির ইন্টারভিউ দিচ্ছেন তার সাথে এই দিকটির সম্পর্ক এবং আপনার এই আগ্রহ যে উক্ত চাকরির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ তাও বর্ণনা করতে ভুলবেন না!

৬। এই প্রশ্নে অন্যদের উত্তর থেকে ধারণা নিন

এই বিষয় নিয়ে কেনো পড়াশোনা করলেন? – এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর খুঁজে বের করা সহজ না। আপনার উত্তর হতে হবে সত্যি, বিশ্বাসযোগ্য এবং পছন্দনীয় – যা হায়ারিং ম্যানেজারকে মুগ্ধ করতে পারে। এক উত্তরে এতো কিছু কীভাবে সম্ভব? আপনাকে অনুপ্রাণিত করতে এখানে থাকছে এমন একটি উত্তরের উদাহরণ।

আমি জানি আজকের এই অগ্রগামী বৈশ্বিক অর্থনীতিতে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, কোডিং, মেশিন লার্নিং, স্মার্ট টেকনোলজি এবং অন্যান্য যেসব টেকনোলজি আমাদের ভবিষ্যৎ গড়তে সাহায্য করছে সেগুলোর ব্যাপারে জানা কতোটা গুরুত্বপূর্ণ। স্কুলে পড়াশোনা করার সময় আমি আমার সায়েন্স ক্লাসে বেশ ভালো রেজাল্ট করতাম, তাই আমার ধারণা হয় বিজ্ঞানের কোনো বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করার আমার জন্য ভালো হবে এবং ভবিষ্যতে আমি যে ধরনের ক্যারিয়ার আশা করি তাও পাব। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে কম্পিউটার সায়েন্স নিয়ে আমার পড়াশোনার সময় আমার বেশ অনেকগুলো রিসার্চ প্রজেক্ট, অটোমোবাইল চালনা, রোবোটিক্স এবং আরও অনেক ধরনের কাজ করারও সুযোগ হয়েছে।

 

আগ্রহ, সততা এবং দক্ষতা – এই তিনটি বিষয় উঠে আসতে হবে আপনার “এই বিষয় নিয়ে কেনো পড়াশোনা করলেন?” প্রশ্নের জবাবে। আপাতদৃষ্টিতে হয়তো আপনার এই বিষয় পড়ার পেছনে তেমন কোনো গভীর কারণ চোখে পড়ে না। কিন্তু একটু চিন্তা করলেই বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে একটা বিষয় নিয়ে পড়ার বেশ কিছু উদ্দেশ্য ও প্রভাব খুঁজে বের করা সম্ভব। নিজের সিদ্ধান্তে পড়ে থাকেন অথবা অন্য কারো, একটা সাদামাটা গল্পকেও একটু চেষ্টা করলেই একটা ভিন্নধর্মী ও আকর্ষণীয় কাহিনী হিসেবে উপস্থাপন করা যায়।